
মো: আকরাম হোসেন
ঢাকা কলেজ,ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত থাকা এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা নানা সংকট ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষাজীবনে ব্যাপক হতাশা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। এর প্রতিবাদে গত রবিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।
সাতটি ঐতিহ্যবাহী কলেজ—ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং মিরপুরের বাঙলা কলেজ—প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় এবং পালাক্রমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যায়। অবশেষে ২০১৭ সালে সরকারের নির্দেশে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়।
এই অধিভুক্তকরণের পর থেকেই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। শিক্ষা কার্যক্রমের ধীর গতি, পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্ব, প্রশাসনিক জটিলতা, এবং ঢাবির মূল ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের তুলনায় সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। শিক্ষার্থীরা বারবার আন্দোলন করলেও সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি। ফলে, তারা স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে আবারও সোচ্চার হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সাত কলেজকে ঢাবির অধিভুক্ত করা হয়। তবে, এই সিদ্ধান্ত ছিল তাড়াহুড়ো করে এবং যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই নেওয়া। অধিভুক্ত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি এবং কার্যকর প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান করা। কিন্তু আট বছর পেরিয়ে গেলেও এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। বরং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আরও বিশৃঙ্খল হয়েছে। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “ঢাবির প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বৈষম্যমূলক নীতিমালার কারণে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।”
এ অবস্থায়, সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে বলছেন, নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো এবং স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে। তারা মনে করেন, ঢাবির অধিভুক্ত থাকার ফলে তারা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং শিক্ষাজীবনে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট পোহাতে হচ্ছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ স্মারকলিপি গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন এবং এই বিষয়ে আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সাতটি কলেজকে পৃথক অনুষদ হিসেবে গড়ে তুলে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা সম্ভব। তবে এজন্য শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আমাদের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, শিক্ষা উপদেষ্টা, ঢাবি উপাচার্য এবং সাত কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সমাধান করা হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছিলেন। এছাড়া বিগত সময়ে নীলক্ষেত মোড়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে বহুবার আন্দোলনে নেমেছেন। এই আন্দোলনের কারণেই সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দুরবস্থা সম্পর্কে প্রশাসনের নজর পড়ে।
শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, সাত কলেজকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে মুক্তি পাবেন এবং তাদের শিক্ষাজীবন আরও উন্নত ও গতিশীল হবে। তারা মনে করেন, স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সাত কলেজ পরিচালিত হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সময়মতো ফলাফল প্রকাশসহ একাধিক সমস্যা সমাধান হবে, যা বর্তমানে সম্ভব হচ্ছে না।