
ভোরের বাংলা নিউজ প্রতিবেদক
আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ে রোজার আগে ১ মার্চ থেকে বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। সমন্বয় করতে গিয়ে এই দফায় ৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। আজকালের মধ্যে সরকারের নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রোজার আগে ঘাটতি সমন্বয়ে একবার দাম বাড়ানো হলেও ঈদের পর এপ্রিলে আরও এক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। গ্রাহকদের ওপর একবারে বেশি চাপ না দিতেই দুই দফায় ৫ শতাংশ করে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ নেওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসা। এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে ভর্তুকি কমাতে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। নতুন সরকার গঠনের পর ফের বিদ্যুতের সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালবেলাকে বলেন, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মানের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কমাতেই বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। ঘাটতি কমাতে হলে দাম সমন্বয় করতেই হবে। ঈদের পর আবারও দাম সমন্বয় হবে কি না এ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, লাইফ লাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৩০ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের ওপরে গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা বাড়বে।
পিডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি শূন্যে নামাতে হলে বাল্ক (পাইকারি) মূল্যহার প্রায় ৮০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে। চলতি মাস থেকেই তা কার্যকরের প্রস্তাব করা হয়েছিল। যদিও তা এক মাস পর মার্চ থেকে কার্যকর করা হচ্ছে। এই বাল্ক মূল্যহার বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ও সংস্থাগুলোর লোকসান ঠেকাতে গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম ৭৮ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। সরকার একবারে বেশি সমন্বয় না করে ধাপে ধাপে সমন্বয় করার পরিকল্পনা করছে। আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গণশুনানির মাধ্যমে দাম বাড়ালেও ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সরাসরি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করছে।
পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয় ছিল পাঁচ দশমিক ৭৫ পয়সা। সরকার নির্ধারিত গড় বাল্ক মূল্যহার ছিল চার টাকা ৮৪ পয়সা। ফলে ইউনিটপ্রতি ৯১ পয়সা লোকসান গুনতে হতো পিডিবিকে। ২০২২ সালে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর গড় বাল্ক মূল্য বেড়ে হয়েছিল পাঁচ দশমিক ৯৮ টাকা; কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট সরবরাহ ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৩৮ টাকা। ফলে গত অর্থবছর বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে পাঁচ টাকা ৪০ পয়সা।
জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছর পিডিবির লোকসান ছিল ৫১ হাজার ৩০০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। একই সময়ে ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে ৩৯ হাজার ৫৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ভর্তুকি চেয়েছিল সরকারি এ সংস্থাটি। যদিও জুন পর্যন্ত ছাড় করা হয় মাত্র ৭ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। ভর্তুকির অবশিষ্ট অর্থ নগদে না দিয়ে বন্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করছে সরকার। আর চলতি অর্থবছর ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৬০৬ কোটি ২০ লাখ টাকা।
গত অর্থবছর পিডিবির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানির পরিমাণ ছিল আট হাজার ৭০৪ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা। এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ৯৬ হাজার ৮৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ গড়ে উৎপাদন ব্যয় পড়ে ১১ টাকা ০৪ পয়সা। এর সঙ্গে তিন শতাংশ সঞ্চালন লোকসান, বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল ইউনিটপ্রতি ১৫ পয়সা এবং ছয় শতাংশ উৎসে আয়কর যোগ করে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় দাঁড়ায় ১২ টাকা ১১ পয়সা। যদিও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য ছয় টাকা ৭০ পয়সা। এই হিসেবে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ বিক্রিতে পাঁচ টাকা ৪১ পয়সা লোকসান হয়েছে পিডিবির।