
এম,এ মোমেন কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি
তিনজনের শত কোটি টাকার সম্পদ, অবৈধ নিয়োগ সিন্ডিকেটের হোতারা গ্রেফতার
গাজীপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগের প্রয়োজনীয় সনদ ও সিলমোহর জাল করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের মূল তিন হোতাকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। তারা প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক।
গত ৪ জুলাই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার এসএম হাসান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে তাদেরঙ রাজধানীর বেইলী রোডের ফখরুদ্দিন হোটেলের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আসামিদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখসহ ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বিএড ও এনটিআরসিএসহ বিভিন্ন জাল সনদ তৈরি করে দেশের বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসায় অবৈধভাবে নিয়োগ এবং এমপিওভুক্ত করে দিয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়ার টোক এলাকার একটি জালিয়াতচক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে গোপন সংবাদ আসে। ওই চক্রের মূল হোতারা এনটিআরসিএ কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ২০১৬ সালের আগে নিয়োগ দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গাজীপুরের কাপাসিয়া মাধ্যমিক অফিসের কতিপয় কর্মকর্তার সহযোগিতায় অনিয়ম ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করে আসছে।
এসব বিষয়ে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্তৃপক্ষ আলোচনা করলে তাদের ডিবি কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে গত ২ জুলাই মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাদী হয়ে ডিএমপি ঢাকা কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দেন।
বিষয়টি আমলে নিয়ে ডিবির সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের একটি অভিযানিক দল তাকে সঙ্গে নিয়ে একটি ছায়া তদন্তের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডের ফখরুদ্দিন হোটেলের সামনে থেকে তিন মূল হোতাকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- কাপাসিয়ার টোক নগর দারুল হাদিস আলিম মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মো. আশরাফুল আলম, স্থানীয় টোক বাজারের কম্পিউটার কম্পোজের দোকান মালিক ও গফরগাঁও উপজেলার দত্তের গাঁও কলেজের প্রদর্শক স্বপন ব্যানার্জি ও সোহাগপুর আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আ ন ম আব্দুল্লাহ। এ সময় আশপাশে থাকা সুমন (৩৪), শাকিল আহমেদ (২৭) ও আব্দুস সালাম (৫৮) নামে অপর তিন আসামি পালিয়ে যান। আসামিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসায় নিয়োগ প্রত্যাশীদের বিপুল পরিমাণ জাল সনদ ও কাগজপত্র পাওয়া যায়।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার তিন আসামি স্বীকার করেন- তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য। বহু বছর ধরে তারা এ কাজে জড়িত রয়েছেন। তারা পালিয়ে যাওয়া অপর আসামিদের নাম উল্লেখ করেন এবং তাদের সঙ্গে আরও অজ্ঞাতনামা ৭ থেকে ৮ জন জড়িত রয়েছেন বলে জানান।
টোকের কেন্দুয়াব এলাকার মাহাবুর রহমান বলেন, টোক বাজারকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ডিজি অফিস বলা হয়ে থাকে। ঢাকা ডিজি অফিস থেকে যেসব শিক্ষক কর্মচারীকে বিভিন্ন কারণে এমপিওভুক্ত করা হয় না, টোকের ওই তিন ব্যক্তির কাছে এলে তাদের এমপিও হয়ে যায়। জাল সনদ ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যের অপরাধে এ চক্রের সাবেক প্রধান হোতা আ ন ম আব্দুল্লাহ এর আগেও কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন। জেল থেকে ফিরে এসে পুরোনো অভ্যাসে আবার ফিরে যান। অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে আ ন ম আব্দুল্লাহ অন্তত ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, এই চক্রের বর্তমান দলনেতা আশরাফুল আলম গত ৫ থেকে ৬ বছরে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। আর অবৈধ কাগজ তৈরির কারিগর কম্পিউটার কম্পোজের দোকান মালিক স্বপন ব্যানার্জি ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। কাপাসিয়া ও মনোহরদী উপজেলায় তাদের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষক কর্মচারী কর্মরত আছেন বলেও তিনি দাবি করেন। অবৈধ কাজে সহযোগিতার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের কাছে প্রতিদিন অসংখ্য লোক এসে থাকেন।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য আকবর হোসেন জানান, জাল সনদ ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে এ চক্রটি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।
এ বিষয়ে ওই মামলার বাদী মো. নয়ন মিয়া জানান, তার অধিদপ্তরের অভিযোগের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ কাপাসিয়ার জালিয়াত চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে কাপাসিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুস সালাম জানান, প্রতারণার অভিযোগে ওই তিন ব্যক্তির গ্রেফতারের খবর শুনেছি। তাদের নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে আমি জড়িত না এবং অফিসের কেউ জড়িত আছেন বলে জানা নেই। আর পলাতক আসামি হিসেবে যে আব্দুস সালামের নাম রয়েছে তার সঙ্গে আমার নামের বানান ও বয়সের মিল নেই।