
মো:আকরাম হোসেন,ক্যাম্পাস প্রতিনিধি।
ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৪
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত “মেন্টাল হেলথ ক্রাইসিস: ডিলিং উইথ পোস্ট জুলাই রেভ্যুলেশনারি আসপেক্টস” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা জানিয়েছেন, দেশের নব্বই শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সেবার বাইরে রয়ে গেছেন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ৮ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য সেবার করুণ চিত্র
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ২২ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন এবং ১,৪২৩ জনেরও বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে।” তিনি আরো উল্লেখ করেন, দেশে এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ মাত্র ০.৫%।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) এবং বিষণ্ণতার মতো জটিল মানসিক রোগের মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। বর্তমানে দেশের তিন হাজারেরও কম মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর মধ্যে ৮০% রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করেন, যা অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের জন্য সেবা পাওয়া অসম্ভব করে তুলেছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত ও আশার আলো
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি জানান, “গণঅভ্যুত্থানে আহত এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। মানসিক সেবার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, “গণঅভ্যুত্থানে আহতদের সহায়তা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে শিক্ষা ও সেবার সমন্বয় করা হবে।”
৮ দফা প্রস্তাবনা
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, “জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর দেশের ১৮ কোটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা অপরিহার্য।” এ লক্ষ্যে সেমিনারে ৮ দফা সুপারিশ করা হয়:
১. টাস্কফোর্স গঠন: অভিজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স তৈরি।
২. আহত ও বিপর্যস্তদের তালিকা: আন্দোলনে আহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্তদের সেবা নিশ্চিত করা।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার স্থাপন।
৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ট্রমা কর্মশালা: স্কুল-কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল প্রতিষ্ঠানে ট্রমা রিকভারি কর্মশালা আয়োজন।
৫. হটলাইন সেবা চালু: মানসিক সমস্যাগ্রস্তদের জন্য একটি জাতীয় হটলাইন চালু।
৬. গবেষণা সেল গঠন: মানসিক সেবা প্রদানের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ ও গবেষণা সংরক্ষণ।
৭. মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট বাস্তবায়ন: ২০১৮ সালের মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট অনুযায়ী মনিটরিং কমিটি গঠন।
৮. জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: ২০২০-৩০ সালের মানসিক স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা কার্যকর করা।
বক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক ডা. এম. মোজাহেরুল হক বলেন, “আন্দোলনে অংশ নেওয়া আহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যরাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।”
চরকির সিইও রেদওয়ান রনি বলেন, “আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়েও অনেক নির্মাতা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতার জন্য পরিকল্পনা থাকা জরুরি।”
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চাইল্ড হেল্পলাইনের ম্যানেজার মো. মোহাইমিন চৌধুরী জানান, “আন্দোলনের সময় চাইল্ড হেল্পলাইনে কলের সংখ্যা বেড়েছে। অনেক শিশুই এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।”
সমাপ্তি মন্তব্য
সেমিনারটি পরিচালনা করেন সাকিব প্রত্যয়। আঁচল ফাউন্ডেশন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান গণমুক্তির আয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এই ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতে আরও জোরদার হবে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন।