
তারেক মুহাজির, জাবি প্রতিনিধি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখার ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অর্থ কেলেঙ্কারির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর হুমকির মুখে পড়েছেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সৈকত ইসলাম। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যসহ রিপোর্ট প্রকাশের পর থেকে তার ওপর চাপপ্রয়োগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং ছাত্রদলের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহারের প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার দুপুর ১টায় শহীদ মিনার সংলগ্ন প্রধান সড়কে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকবৃন্দের উদ্যোগে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ক্যাম্পাসে কর্মরত বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ‘প্রথম আলো’ সংবাদপত্রের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঞ্চালনায় বিভিন্ন সাংবাদিকগণ সংহতি জানিয়ে মানববন্ধনে বক্তারা বক্তব্য রাখেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক জনকণ্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ওয়াজহাতুল ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে আমরা সাংবাদিকতার মৌলিক সংস্কার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু আজ আমাদের এখানে দাঁড়াতে হয়েছে একজন সাংবাদিককে হুমকির প্রতিবাদে।
তিনি আরও বলেন, সংবাদে ত্রুটি থাকলে সেটি সংশোধনের জন্য যথাযথ প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি, সংবাদপত্রের ওপর পেশিশক্তি প্রয়োগ করে সংবাদ সরিয়ে ফেলার চাপ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে যে অশোভন ও অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, ছাত্রদল তাদের বক্তব্যের ভাষা সংশোধন করবে এবং দলের ভেতরে যে অপকর্ম হয়েছে, তার সঠিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও বণিক বার্তার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মেহেদী মামুন বলেন, সারা দেশে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে নতুন গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তার অন্যতম উৎস ছিল এই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে প্রথম গুলির সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল আমাদের সহকর্মীরা। আজ যখন এই সহকর্মীদের মানসিকভাবে নিপীড়ন করা হয়, তখন আমাদের আর বসে থাকার সুযোগ থাকে না। আমাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতেই হয়, দাবি জানাতেই হয়। কিন্তু আমাদের কাজ ছিলো কীবোর্ডের সামনে বসে সংবাদ লেখা। কিন্তু আজ সেই দায়িত্ব ছেড়ে মানববন্ধনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছি। আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, গত ১৫ বছর আপনারা যে নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গেছেন, তখন সাংবাদিকরাই ছিলেন আপনাদের একমাত্র বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী।
তিনি আরও বলেন, আপনাদের বক্তব্যে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমরা আশা করেছিলাম, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ভুলত্রুটি নিরূপণ কর গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। কিন্তু তার পরিবর্তে আপনারা সেই পুরনো ফ্যাসিস্ট কায়দায় সাংবাদিকদের ট্যাগ দিয়েছেন । আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমরা দাবি জানাই—আপনারা অবিলম্বে এই ধরনের বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন এবং ক্ষমা চাইবেন।
এদিকে মূলত, গত ২৪ এপ্রিল ‘আওয়ামী এমপিকে পুনর্বাসন/ ভাগবাটোয়ারার দ্বন্দ্বে জাবিতে ছাত্রদলের ভ্যাকসিন কর্মসূচি স্থগিত’ শিরোনামে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। এতে হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচির আড়ালে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের চিত্র উঠে আসে। সংবাদটি প্রকাশের পর থেকেই সাংবাদিক সৈকতের ওপর শুরু হয় চাপ প্রয়োগ। ‘সময়ের আলো’ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার পরিচয়ে সাব্বির আহমেদ একাধিকবার ফোন করে জেরা করেন এবং কথোপকথনের এক পর্যায়ে হুমকির সুরে বলেন, “এটা নিয়ে রিট হবে।”
সৈকত ইসলাম অভিযোগ করেন, আমি ক্লাসে থাকার কারণে ফোন ধরতে পারিনি। পরে কল ব্যাক করলে তিনি আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন এবং আমাকে নাসির উদ্দিন নাসিরের পক্ষ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকেন। এরপরই জাগোনিউজ২৪.কম ওয়েবসাইট থেকে প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেওয়া হয়, যা সাংবাদিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। সৈকত বলেন, “এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। আমি পেশাগত ও ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ছাত্রদলের জাবি শাখা ২০ এপ্রিল থেকে বিনামূল্যে হেপাটাইটিস-বি টিকা কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দিলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। আরও জানা যায়, এই কর্মসূচির আড়ালে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নাসের শাহরিয়ার জাহেদীর অর্থে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বাজেট তৈরি হয়। টিকা কিনতে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা খরচ ধরা হলেও বাকি ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নিয়ে নেতাদের মধ্যে ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই কর্মসূচিকে ঘিরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির, জাবি শাখার আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর, সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক এবং যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ফয়সাল হোসেনের মধ্যে তীব্র মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।
অপর দিকে এ ঘটনায় ছাত্রদলের একাংশ ২৪ এপ্রিল রাতে বটতলায় সংবাদ সম্মেলন করে বর্তমান কমিটি বিলুপ্তির দাবি জানায়। তাদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে – ভ্যাকসিন দুর্নীতির তদন্ত, দোষীদের বহিষ্কার এবং নতুন স্বচ্ছ নেতৃত্বে কমিটি গঠন। তারা অভিযোগ করেন, ১৭৭ সদস্যের কমিটিতে অন্তত ১৩ জনের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিনেও কোন পরিচিতি সভা, সাংগঠনিক কর্মসূচি কিংবা কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি।
এ দিকে রিপোর্ট সরিয়ে ফেলা এবং তাকে ব্যক্তিগত হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ। সংগঠনটি এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দাবি করেছে।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের মুখপাত্র আশরেফা খাতুন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাকস্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার জন্য যে সংগ্রাম হয়েছে, তা আজও অব্যাহত। সত্যের প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টার আমরা ঘোর বিরোধিতা করি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বিগত পনেরো বছর ধরে “ফ্যাসিস্ট হাসিনাশাহী” শাসনামলে বারবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়েছে এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধার মুখে পড়েছে। আমরা মনে করে, বর্তমানে ফের সেই দমন-পীড়নের পরিবেশ তৈরি করার অপচেষ্টা চলছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের সাহসিকতার প্রশংসা করে ছাত্র সংগঠনটি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের সাহসী ভূমিকা আমাদের আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আজ তাদের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য হুমকিস্বরূপ। ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রের কাছে সাংবাদিক সৈকত ইসলামসহ সকল সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের এবং বাকস্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এই ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।