
তারেক মুহাজির, জাবি প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম কুন্তশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
রোববার ১৯ মে সন্ধ্যা ৭.০০ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পাশে যাত্রীছাউনি সংলগ্ন বটবৃক্ষের নিচে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিবৃত্তি, জ্ঞানচর্চা ও উৎপাদনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিশেবে দেশব্যাপী সমাদৃত। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম। তারই ধারাবাহিকতায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও আলোচনার কেন্দ্র হিশেবে কুন্তশালা নামক পাঠচক্রের আত্মপ্রকাশ। রোববার সন্ধ্যায় শহীদ মিনারের পাদদেশে মশাল ও ধূপ জ্বেলে এক আলোআঁধারিতে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান অমিতের সঞ্চালনায় অতিথি ও সংগঠকরা তাঁদের শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। হাসান অমিত বলেন,
মানুষ যেন প্রশ্ন করতে এবং উত্তর দিতে ভয় না পায়৷ কোনো আইন যেন তাকে বন্দি না করে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে মানুষ যুক্তি ও প্রশ্নের উত্তর যুক্তি দিয়ে, কথা দিয়ে না দিয়ে হাত দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে৷ যা মূলত একটা ভুল অনুশীলন। এবং এর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে৷ এই ধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসার জন্যই এই কুন্তশালা একটা মডেল বলা যায়৷ যেখানে আমরা দেখানোর চেষ্টা করবো যে ভিন্ন মত ও পথের মানুষও কীভাবে যুক্তি ও জ্ঞানগর্ভ তর্কের মাধ্যমে নতুন মত ও পথের প্রতিষ্ঠা করা যায়।
পাঠচক্রটির উদ্যোক্তা হিশেবে রয়েছেন দর্শনবিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ নিযার। তিনি আমন্ত্রিত সকলকে অভিবাদন ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন।
কুন্তশালা’র নামকরণ বিষয়ে অধ্যাপক সৈয়দ নিযার বলেন, “পূর্বদেশের সংস্কৃতি এবং ভূমিপ্রথা এই অঞ্চলের দর্শনচর্চা এবং জীবনযাপনে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। ভূমিপ্রথার সংস্কার সাধন হয় বিম্বিসারের সময়। এই সময় সমস্ত পতিত ভূমিকে রাষ্ট্রের অধিভুক্ত করা হয়। তাই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থাকার স্থানের তাগিদে কোনো না কোনোভাবে পৃষ্ঠপোষক প্রয়োজন। তাছাড়া ব্রহ্মজাল সূত্র থেকে জানা যায়, গৌতম বুদ্ধ যখন নগর বা গ্রামে ভিক্ষার উদ্দেশ্যে বের হতেন, তাঁর সাথে প্রায় ১২৫০ জনের মতো মানুষ থাকতো। স্বাভাবিকভাবেই এত মানুষকে আপ্যায়ন সম্ভব না। তাই পৃষ্ঠপোষক কাউকে পাওয়ার এবং গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আবার যেহেতু এখানে ভিন্ন মত ও পথের সংঘ ( Group) রয়েছে। তাই পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বিতর্ক। বিতর্ক অর্থই হলো যুক্তিচর্চা আর বিতর্কে জয়ী হতে পারলে পৃষ্ঠপোষক সহজেই অর্জন করা যেত। যেখানে বিতর্ক করা হতো সেই স্থানটির নাম হলো – ‘কুন্তশালা’। ‘কুন্ত’ শব্দের অর্থ হলো – প্রশ্ন, আর ‘শালা’ শব্দের অর্থ হলো স্থান। এভাবে কুন্তশালা অর্থ হলো বিতর্কের স্থান৷”
তিনি আরো বলেন, “এই অঞ্চলের বিতর্কের ইতিহাস অনেক প্রাচীন৷ যেখানে বিভিন্ন মত এবং পথ খন্ডনের স্বাধীনতা ছিলো। এই বিতর্ক, যুক্তিচর্চা যেন অথোরিটির কাছে আটকে না যায়, সেই প্রতীক হিসেবে আমাদের জাহাঙ্গীরনগরে এসেছে কুন্তশালা।”
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আজিজুল হাকিম বলেন, আমরা আসলে অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম এধরনের মুক্ত একটি প্ল্যাটফর্ম করার। ৫ আগষ্টের পর সেই ভাবনা আরও শাণিত হয়। আমাদের অসহিষ্ণু সমাজে প্রশ্নের উত্তর যাতে প্রশ্ন দিয়েই দেওয়া যায়, সুস্থ বিতর্ক করা যায় এবং জাহাঙ্গীরনগরে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে যাতে আরও এগিয়ে নেওয়া যায় সেই জায়গা থেকেই কুন্তশালার যাত্রা। নিযার স্যার এখানে মূখ্য ভূমিকা রেখেছেন। কুন্তশালার পরিসর আরও বড় হবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।
অতিথিদের বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি সমাপ্ত হয়।