
টাংগাইল জেলা প্রতিনিধি
রাহিদ রানা
“সুর তো কেবল মুখের কথা নয়, বুকের ভেতর নদী,শিক্ষকতার চক ডাস্টার থামলেও গান থামে কি কদি?”
শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার হাতে যিনি ছড়িয়েছেন শিক্ষার আলো, অন্তরে তিনি ধারণ করেছেন সুরের অনন্ত ঝরনাধারা। দীর্ঘ তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে গেছেন। কিন্তু যে মানুষটি ৪০ বছর ধরে সুরের ভেলায় ভেসে চলছেন, অবসরের বাঁধাধরা নিয়ম কি আর তাকে আটকে রাখতে পারে? বলছিলাম টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের সাধুটি মধ্যপাড়া গ্রামের সন্তান, বীরাচারী বসুবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুস সালামের কথা। এলাকায় যিনি একাধারে প্রবীণ শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং অত্যন্ত ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে পরিচিত।
শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে সুরের ভেলায়
মরহুম ইসমাইল হোসেনের সুযোগ্য সন্তান আব্দুস সালামের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল সাধুটি নজিব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে ১৯৮১ সালে তিনি সফলতার সাথে এসএসসি পাশ করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে ঘাটাইল জিবিজি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৮৮ সালে ডিগ্রি অর্জন করেন।
ডিগ্রি পাশের পর জীবনের সোনালী সময় থেকে প্রায় ৭-৮ বছর তিনি শুধু গানের পেছনেই ছুটে বেরিয়েছেন। সুরের প্রতি সেই প্রেম থেকেই ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি বীরাচারী বসুবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি গত চার দশক ধরে সমান তালে চালিয়ে গেছেন নিজের সঙ্গীত সাধনা। ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই বিদ্যালয় থেকে এক আবেগঘন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানানো হয়।
“গানই আমার জীবনের নিঃশ্বাস”: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুস সালাম
ব্যক্তিজীবনে দুই কন্যা সন্তানের জনক তিনি; বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং ছোট মেয়ে বর্তমানে দশম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। অবসর জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসিমুখে শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন,
“শিক্ষকতা ছিল আমার পেশা আর গান হলো আমার নিঃশ্বাস। চক-ডাস্টার ছেড়েছি ঠিকই, কিন্তু সুর ছাড়ব কীভাবে? ১৯৮১ সালে এসএসসি পাশের পর থেকেই গানে আমার মন ডুবে ছিল। ৭-৮ বছর তো বলতে গেলে গানেই বুঁদ হয়ে থেকেছি। আজ অবসরে এসে মনটা আরও মুক্ত। এখন যেখানেই গানের আসর হয়, সুরের ডাক আসে, সেখানেই ছুটে যাই। গান গেয়ে মানুষের মন স্পর্শ করার মধ্যেই আমি জীবনের আসল আনন্দ খুঁজে পাই।”
“সালাম স্যার আমাদের গ্রামের গর্ব”: এলাকাবাসী ও স্থানীয়দের ভাবনা
শিক্ষক আব্দুস সালামের এই দীর্ঘ সঙ্গীতপ্রীতি ও নিরহংকার জীবনযাপন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সাধুটি মধ্যপাড়া গ্রামের প্রবীণ ও তরুণদের মতে, সালাম স্যারের মতো মানুষ সমাজে বিরল।
এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সালাম স্যারকে আমরা ছোটবেলা থেকেই গান গাইতে দেখছি। স্কুলে যেমন উনি নিষ্ঠার সাথে পড়িয়েছেন, তেমনি গ্রামে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে সালাম স্যারের গান ছাড়া জমতোই না। অবসরে যাওয়ার পর উনাকে আরও বেশি গানে গানে পাওয়া যাচ্ছে। উনি একজন সত্যিকারের সাদা মনের মানুষ।”
বসুবাড়ী এলাকার এক অভিভাবক স্মৃতিচারণ করে বলেন, “উনি শুধু আমাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাননি, কীভাবে সংস্কৃতিমনোভাব নিয়ে ভালো মানুষ হওয়া যায় সেটাও শিখিয়েছেন। বিদায় সংবর্ধনার দিন আমাদের সবার চোখেই পানি ছিল। অবসরে এসেও উনি যে গানের মাঝে নিজের আনন্দ খুঁজে নিচ্ছেন, এটা দেখতেও খুব ভালো লাগে।”
সুরের ধারায় কাটুক বাকি জীবন
৮০-র দশক থেকে শুরু হওয়া যার সুরের সফর, জীবনের এই প্রান্তে এসেও তা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। পেশাগত জীবনের ইতি ঘটলেও সাধুটি মধ্যপাড়া গ্রামের এই গুণী শিক্ষকের সঙ্গীতযাত্রা অব্যাহত থাকুক চিরকাল—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর হাজারো শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর।