
প্রীতম কান্তি গোপ, কুবি প্রতিনিধি
লাল মাটির পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসে প্রতিদিন হাজারো শব্দের কোলাহল। বাংলা ও ইংরেজির প্রাধান্যে মুখরিত শ্রেণিকক্ষ, সেমিনার আর করিডোর। তবে এই শব্দমালার ভিড়ে কিছু সুর যেন ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। ত্রিপুরা, চাকমা বা মারমা ভাষাভাষী শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ভাষাগুলো অধিকাংশ সময় সীমাবদ্ধ থাকে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়; প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে সেগুলোর উপস্থিতি একেবারেই অদৃশ্য।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কিংবা বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজনে বিষয়টি আলোচনায় এলেও বছরজুড়ে তা আড়ালেই থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মতে, মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয় এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মান্তরে বহমান আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী বিশ্বজয় ত্রিপুরা বলেন, “মাতৃভাষা একটি জাতির ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রাণশক্তি। বাংলা ও ত্রিপুরা ভাষার গঠনভিত্তি আলাদা হওয়ায় শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ভিন্ন মাধ্যমে পাঠদান অনেক সময় ত্রিপুরা শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার ভিত আরও মজবুত হবে। তাই ত্রিপুরাসহ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষাগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী অডিথ চাকমা বলেন, “একজন শিশু প্রথম যে ভাষাটি শেখে, সেটিই তার মাতৃভাষা। একজন চাকমা হিসেবে ‘চাকমা’ ভাষায় কথা বলতেই আমি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মানুষ নিজের মাতৃভাষায় যে গভীরতা ও আবেগ প্রকাশ করতে পারে, অন্য ভাষায় তা সবসময় সম্ভব হয় না। সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, বাংলাদেশের প্রতিটি জাতিসত্তার মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।”
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী রেমী চাকমা মনে করেন, “ভাষার বৈচিত্র্য মানবসভ্যতার অমূল্য সম্পদ। বিশ্বায়নের এ যুগে নিজের ভাষার পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিপন্ন ভাষাগুলোর সংরক্ষণ ও বিকাশে আমাদের দায়বদ্ধ হতে হবে। প্রতিটি ভাষার মর্যাদা রক্ষা করাই হোক মাতৃভাষা দিবসের প্রকৃত অঙ্গীকার। মাতৃভাষার ভিত মজবুত হলে আমাদের অগ্রযাত্রাও হবে আরও সুদৃঢ়।”
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই বহুমাত্রিক চিন্তা ও সংস্কৃতির সহাবস্থান। কিন্তু এই বহুভাষিক পরিবেশে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ভাষাগুলো যদি সমান মর্যাদা ও চর্চার সুযোগ না পায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সনদধারী গ্র্যাজুয়েট তৈরির প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রতিটি ভাষা পাবে সমান সম্মান, আর প্রতিটি কণ্ঠস্বর শোনা হবে সমান গুরুত্বে।