
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি
চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়া তারা মসজিদ সংলগ্ন নিজ বাড়িতে অঞ্জলি রাণী বিশ্বাস (৫৫) নামে এক নারীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরতলীর দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়ায় একটি বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত অঞ্জলি রাণী দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়ার নরসুন্দর গনেশ প্রামাণিকের স্ত্রী ও চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার তালতলা গ্রামের মৃত মেঘনা চন্দ্র প্রামাণিকের মেয়ে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ অঞ্জলী রাণী বিশ্বাসের লাশ উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়ায় স্বামীর সাথে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নিজ বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন অঞ্জলী রাণী বিশ্বাস। সঞ্জিতা রাণী বিশ্বাস নামে তাদের একটি মেয়ে ছিলো। যিনি গত ১৫ বছর আগে শ্বশুরবাড়িতে গলাই দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সেই থেকে অঞ্জলী রাণী বিশ্বাস তার ভাইয়ের মেয়ে ঐশীকে নিজের কাছে রাখতেন। গতকাল সকালে তিনি তার স্বামী গনেশ প্রামানিককে খেতে দেন। এরপর স্বামী চুয়াডাঙ্গা আলুকদিয়া বাজারের সেলুনের দোকানের উদ্দেশ্যে বের হলে তিনি নদীতে গোসল করতে যান। গোসল শেষে বাড়ি ফিরে অঞ্জলী রাণী খুনের শিকার হন। মারা যাওয়ার সময় তার পরণের কাপড় ভেজা ছিলো। ধারণা করা হচ্ছে তিনি গোসল শেষে বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে তাকে দুর্বৃত্তরা গলায় ও ঘাড়ে কোপ মেরে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এলাকাবাসীর অনেকে জানিয়েছেন, সম্ভ্যাবত অঞ্জলী রাণী নদী থেকে গোসল শেষ করে বাড়িতে ঢুকলে তার ঘরে কেউ চুরির উদ্দেশ্যে আগে থেকে অবস্থান করছিলো। হয়তোবা তিনি দুর্বৃত্তদের দেখে ফেলায় চিৎকার দেয়ার চেষ্টা করলে তারা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করে নির্বিঘ্নে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়।
অঞ্জলী রানী বিশ্বাসের ভাইয়ের মেয়ে ঐশী জানায়, ‘আমি সকাল ১১টার দিকে বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে দেখি মেইন গেট ভেতর থেকে বন্ধ। আমি অনেক্ষণ দরজা ধাক্কা দিতে থাকি। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরে জানালা ধাক্কা দিতে থাকি। এরপর জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পায় পিশি মেঝেতে পড়ে আছে। তখন আমি চিৎকার দিয়ে আশপাশের লোকজনকে ডাকি। প্রতিবেশীরা এসে পাঁচিল টপকে মেইন গেট ভেতর থেকে খুলে দেয়। এরপর ভিতরে ঢুকে দরজা খোলা পেয়ে দেখি পিশির লাশ মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আমি সাথে সাথে পিশেমশাইকে মোবাইলে খবর দিই।
নিহতের ছোট ভাই অশোক কুমার জানান, আমার বোনের কোন সন্তানাদি না থাকায় আমার মেয়ে তার সঙ্গে থাকতো। গতকাল শনিবার কলেজ থেকে ফিরে বাড়িতে এসে দেখে বোনের মরদেহ পড়ে আছে। বিষয়টি আমাকে জানালে আমিও দোকান বন্ধ করে চলে আসি। তিনি আরও বলেন, আমার বোন অসুস্থ ছিল।আমার মেয়ের সঙ্গে সকালে চিকিৎসকের নিকট যাওয়ার কথা ছিল। আমার বোনের শরীরে পরিহিত গহনা ঠিক থাকলেও ঘরের বাক্সের তালা ভেঙে তিন ভরি সোনার গয়না ও নগদ দুই লাখ টাকা নিয়ে গেছে। ধারণা করছি আমার বোনকে হত্যার পর নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুট করে পালিয়ে গেছে।
অঞ্জলি রানী বিশ্বাসের স্বামী গনেশ প্রামাণিক জানান, ‘সকাল ৯টার দিকে আমার স্ত্রীকে খাবার দিতে বলি। খাওয়া শেষে দোকানে যাওয়ার সময় আমি তাকে বলে যায় ঐশী (অঞ্জলী রানীর ভাইয়ের মেয়ে) এলে তাকে সাথে নিয়ে তোমার মাজার সমস্যার জন্য ডাক্তারের কাছে যাবে। এ কথা বলে আমি চুয়াডাঙ্গার আলুকদিয়া বাজারে সেলুনের দোকানে চলে যায়। এরপর ঐশী ফোন দিলে জানতে পারি আমার স্ত্রী অঞ্জলী রাণীকে ঘরের ভেতর ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করা হয়েছে। আমার সাথে কারো কোন শত্রুতা ছিলো না।’ ঘরে কোনো মালামাল খোয়া গেছে কী-না জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমার স্ত্রীর কিছু স্বর্ণালংকার ছিলো। এছাড়াও ঘোলদাড়ি বাজারে একটি জমি বিক্রির ২ লাখ ২৫ হাজার নগদ টাকা ছিলো। সেখান থেকে অল্প কিছু টাকা চিকিৎসা বাবদ খরচ করি। বাকী সম্পূর্ণ টাকা ঘরের ভেতর বাক্সে রাখা ছিলো। স্বর্ণালংকারসহ সেই টাকা বাক্স ভেঙে নিয়ে গেছে।’
এদিকে, দিনদুপুরে বাড়িতে ঢুকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা (বিপিএম-সেবা), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আনিছুজ্জামান লালন, চুয়াডাঙ্গা সদর থানার বিদায়ী অফিসার ইনচার্জ শেখ সেকেন্দার আলী, নবাগত অফিসার ইনচার্জ খালিদুর রহমান ও সিআইডির একটি টিম।
এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আনিছুজ্জামান লালন জানিয়েছেন, ‘আমাদের কাছে সকালে একটা ফোন আসে চুয়াডাঙ্গা দৌলতদিয়াড় দক্ষিণপাড়ায় একটি বাড়িতে ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় এক নারীর মরদেহ পড়ে আছে। এ সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে থানা থেকে দায়িত্বরত অফিসার সেখানে যান। পরে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে দেখতে পায় অঞ্জলি রাণী বিশ্বাস নামে ওই নারীর মরদেহ রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। তার গলায় এবং ঘাড়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর দাগ দেখতে পাই। পরবর্তীতে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার স্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেই সাথে সিআইডির একটি টিমও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্ত কার্যক্রম এবং এ খুনের সাথে যারা জড়িত আছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি আনতে পারবো বলে আশা করছি।