
খুবি প্রতিনিধি
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম থেকেই অংশগ্রহণ করেছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের প্রভাষক হাসান মাহমুদ সাকী। সেই সময়ে অন্যান্য গুটিকয়েক শিক্ষকদের ন্যায় তিনিও প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে বেগবান করতে তিনি নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের সেই সময়গুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাহমুদ সাকী বলেন, “শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে পাশে থাকার জন্য স্বাভাবিকভাবেই আমাকে অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাদের এই যৌক্তিক আন্দোলন থেকে বিরত থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ থেকে যেমন সতর্ক করা হয়েছে তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকেও হয়রানি করা হয়ছে। দেখা গেলো গ্রেফতার কিংবা জীবন নাশের ভয়ে প্রতিটা রাতই আমাকে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছিল।
এছাড়াও তিনি আরো বলেন যে, আল্লাহ না করুক এই আন্দোলন যদি কোনোভাবে ব্যর্থ হতো তাহলে আমাকে নিশ্চিতভাবে চাকুরি তো হারাতে হতোই সাথে আন্দোলনে (পূর্বের স্বৈরাচারী সরকারের ভাষায়) উস্কানি ও পৃষ্ঠপোষকতা দানের জন্য জেল-জুলুম ও সহ্য করতে হতো।
তবে সত্যি বলতে আমি এসব বিষয় জানা সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশে ছিলাম এবং এখনো রয়েছি, ভবিষ্যতেও থাকবো ইনশাআল্লাহ। আমি ছাত্রজীবন থেকেই অনিয়ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলাম।
এখন একটাই চাওয়া, সহস্র প্রাণের বিনিময়ে ছাত্রদের যে বিজয় অর্জিত হয়েছে তা যেন কোনোভাবেই ভূলুণ্ঠিত না হয়। কোনোক্রমেই যেন আমরা ব্যর্থ না হই। এ ব্যাপারে আমাদের সকলের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ভবিষ্যতেও যেন এরকম অগণতান্ত্রিক ও অত্যাচারী শাসক আমাদের মাঝে আর না আসতে পারে। সে বিষয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সতর্ক থাকতে হবে”।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও সহকারী ছাত্রবিষয়ক পরিচালক হিসেবে আমি মনেকরি যে, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুত্বপূর্ণ। যেখানে কোন ভয়ভীতি থাকবে না। শাসন-শোষণ থাকবে না। অত্যাচার-নিপিড়ন থাকবে না। একজন শিক্ষার্থী যেন তাঁর শিক্ষকের কাছে যেকোনো সমস্যা অবলীলায় বলতে পারেন, নির্বিঘ্নে তা সমাধানের জন্য যেতে পারেন। এতে যেন কোনো প্রকার হীনমন্যতা ও প্রতিবন্ধকতা না থাকে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি মাহমুদ সাকী ‘সেভ আওয়ার সোসাইটি’ ও ‘রিভার্স এন্ড লাইফ’ নামক দুটি সামাজিক সংগঠন পরিচালনা করেন। এগুলো মূলত সেচ্ছাসেবী সংগঠন। মাহমুদ সাকী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন সময়ে তিনি ও তাঁর সহপাঠীরা মিলে সমাজের নানামুখী সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে এই সংগঠনগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মাঝে সেইভ আওয়ার সোসাইটির মূল লক্ষ্য হলো সমাজকে সকল সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করে একটি উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মানের লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই সংগঠনটি হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়ন,পাহাড়ী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের অগ্রগতি, বাল্য বিবাহের কু-প্রভাব, বিশ্বের আসু জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের উপর পতিত সংকট সহ নানা কাজে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
আর ‘রিভার্স এন্ড লাইফ’ সংগঠনটি তিনি পরিচালনা করেন মূলত বাংলাদেশের নদী গুলোকে বাঁচানোর লক্ষ্যে। তিনি বলেন- স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে গত কয়েক দশকে যেভাবে এ দেশের নদীগুলো বিলীন হচ্ছে তাতে আগামী কয়েক দশকে নদীশুন্য দেশে পরিনত হবে এই জনপদ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে ভারত যেভাবে অবৈধ ও একতরফাভাবে সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে বাঁধ দিয়েছে তাতে আমাদের এই ভূমি পানিশূন্য মরুভূমিতে পরিনত হতে আর বেশী সময় নেই। রিভার্স এন্ড লাইফ মূলত নদীকেন্দ্রিক এই জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি মাহমুদ সাকী এসকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। সমাজের উন্নয়নমূলক সকল কাজে সবার অংশগ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মনেকরেন।
আশা রাখেন জুলাই অভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশে সবাই মিলে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করলে দেশ ও জাতিকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি সমাজ বিনির্মানের কোনো বিকল্প নেই বলেই তাঁর অভিমত।