
মো. নাজিউল্লাহ ভূঁইয়া
প্রতিনিধি, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
“রং-তুলিতে আমার চোখে জুলাই”— এই হৃদয়ছোঁয়া প্রতিপাদ্যকে ঘিরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।
১৯ জুলাই (শনিবার) সকালে কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ক্যানভাসে ঝলসে উঠলো জাতির সংগ্রাম, শহীদদের আত্মত্যাগ আর স্বাধীনতার লাল সূর্যোদয়ের কথা।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এবং কেরানীগঞ্জ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন ও পিয়ারলেস ইয়ুথ ক্লাবের সহযোগিতায় আয়োজিত এই আয়োজনে উপজেলার ৬২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়, যারা রঙ-তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছে ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে, শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে। জাতীয় সংগীতের গম্ভীর সুরে শুরু হয় দিনের মূল আয়োজন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিনাত ফৌজিয়া আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এ সৃজনশীল আয়োজনের। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন—
“আমাদের শিশু-কিশোরদের চোখে আন্দোলনের ইতিহাস কেমন প্রতিফলিত হয়েছে, তা জানার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন। আগামী প্রজন্ম ইতিহাস জানবে, হৃদয়ে ধারণ করবে এবং গড়ে তুলবে একটি মানবিক, সাহসী বাংলাদেশ। এ আয়োজন ছিল তাদের সেই ইতিহাস-চেতনার পরীক্ষাগার।”
শিশুদের নিঃশব্দ তুলিতে যেন কথা বলে উঠেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের দিনগুলো। ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে দমন-পীড়নের নির্মমতা, শহীদদের আত্মদান, আর প্রতিবাদে জ্বলে ওঠা এক স্বপ্নময় প্রজন্মের জেগে ওঠার গল্প।
বিচারকদের রায়ে নির্বাচিত সেরা ২০টি চিত্রকর্মের শিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। এছাড়াও, প্রতিটি অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীকে প্রদান করা হয় সম্মাননা সনদ—একটি সুন্দর দিনের স্মারক এবং ভবিষ্যতের প্রেরণা।
নয়াবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইশা আক্তার মিশু আবেগভরা কণ্ঠে বলেন—
“এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আমি যেন নতুন চোখে দেখেছি আমাদের ইতিহাসকে। শহীদদের ত্যাগ, সাহস আর সেই গল্পগুলো রঙে-তুলিতে প্রকাশ করতে পেরে আমি গর্বিত। এমন আয়োজন আরও হোক, বারবার হোক।”
অনুষ্ঠানের শেষভাগে শহীদ স্মরণে উপজেলা চত্বরে রোপণ করা হয় ৬টি গাছের চারা—প্রতিটি চারাই যেন একেকটি অঙ্গীকার, একেকটি স্মৃতির দাগ। শহীদ পরিবারের ৬ জন সদস্যকে উপহার দেওয়া হয় ৪টি করে ফলজ ও বনজ গাছের চারা, যা প্রকৃতিকে ভালোবাসার পাশাপাশি শহীদদের প্রতি ভালোবাসারও প্রতীক।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন,
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন,একাডেমিক সুপারভাইজার হালিমা আক্তার,পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা তাইবুর রহমান,
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুর সাত্তার বেগ,
কেরানীগঞ্জ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন ও পিয়ারলেস ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যবৃন্দ,বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অভিভাবক এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।
সবাই মিলে গড়ে তুলেছিলেন এক অপূর্ব সৃজনশীল মিলনমেলা—যেখানে ইতিহাস, শোক আর গৌরব মিলেমিশে একাকার।কেরানীগঞ্জে এই অনবদ্য আয়োজন শুধু অতীত স্মরণের উৎসব নয়—এ ছিল নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের আলোয় আলোকিত করে, দেশপ্রেমে দীপ্ত করে তোলার এক অনন্য প্রয়াস।একটি তুলির আঁচড়ও যে হতে পারে বিপ্লবের বীজ, কেরানীগঞ্জের এই দিনটি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।