
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ ঃ এক সময়ের প্রমত্তা বালুনদ এখন মৃতপ্রায়। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের প্রায় পুরো সময়টাই নদীর বুক থাকে পানিশূন্য। নদীর বুকজুড়ে ধু-ধু বালুচর, কোথাও চাষাবাদ, কোথাও গরু চরানো কিংবা দুরন্ত কিশোরদের খেলাধুলার দৃশ্য চোখে পড়ে। অথচ এ নদীর বুকে চলত জাহাজ। তিন যুগ আগেও বড় বড় ফেরি ও লঞ্চের ভেঁপুর শব্দে কানপাতা দায় ছিল। নদীর চরে হাটতে হাটতে কথাগুলো বলছিলেন শামিম হোসেন।
বালুনদে জাহাজ চালক ফেরদৌস মিয়া বলেন, আশির দশকের শুরুর দিকেও বালুনদী দিয়ে বড় বড় ফেরি-লঞ্চ চলতে দেখা গেছে। আর আজ বালুনদের বুকে পানির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বৃহৎ নদীটির দুরবস্থার কারণে শুধু নৌযান চলাচলই বন্ধ হয়নি, মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা হাজার হাজার জেলে পরিবারেও চলছে দুর্দিন। অনেকেই মাছ ধরার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। যারা পেশা বদল করতে পারেননি, তাদের জীবন কাটছে মানবেতরভাবে।
সরজমিনে উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, বালু, শীতলক্ষ্যা নদীতে বিশাল বিশাল চর পড়েছে। অনেক জায়গায় চলছে নদী দখলের মহাযজ্ঞ। আনার উদ্দিনের বয়স প্রায় ৮২ বছর। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে তার বাড়ি। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও এত খারাপ অবস্থা ছিল না। এই নদী একসময় বাড়ির পাশে ছিল। মাছ ধরতাম, গোসল করতাম। ঘরের কাজ, কৃষি কাজ সব নদীর পানি দিয়েই করতাম। এখন আর নদীতে পানি নেই। বেশির ভাগ জায়গা ভরাট হয়ে গেছে, দখল হয়ে গেছে।’
শামিম মিয়া অতীতের স্মৃতিচারন করে বলেন, ‘ আমরা ছোট বেলায় এ নদীতে দল বেধে গোসল করতাম। এখন নদী দিয়ে হাটা যায়। বালুনদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচকাজে পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ বালু নদী পাড়ের রূহুল আমিন মিয়া বলেন, ‘আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে এই নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালাতাম।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রিগেন মোল্লা বলেন, মাছ, জলজ পতঙ্গ, পাখিসহ অনেক প্রাণী নদীর ওপর নির্ভরশীল। নদী শুকিয়ে গেলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে তারাও, কমবে মাছের প্রজনন। নদীর পাড়ে অবৈধভাবে নদী দখল করে ভরাট করেছেন ব্যবসায়ীরা। দুই পাড়েই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান।
বালু নদী বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের গাজীপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৪৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৯ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার।
কর্তৃপক্ষের সময়োচিত নদী ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের অভাবে বালু নদীটি বর্তমানে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। প্রচ- খরস্রোতা এই নদীটিতে প্রতি বছরের ৭/৮ মাসই পানিশূন্যতা বিরাজ করছে। নাব্যতা সংকটে নৌযান চলাচল ব্যহত, স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগ নিন।
প্রতি বছর নদীর নাব্যতা ফেরাতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয় খননে। তারপরও নদীর নাব্যতা ঠিক রাখা যাচ্ছে না। নৌযান মালিক এবং চালকদের অভিযোগ সঠিকভাবে খনন হয় না বলেই নৌপথে নাব্যতা সংকট কমছে না। আর বিআইডব্লিউটিএ-এর খনন বিভাগের দাবি প্রতি বছর বন্যার পানির ঢলে প্রচুর পলি থাকে। সেই পলি আমাদের নদীগুলোতে জমে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করে। তাছাড়া রাজধানীর ময়লা আবর্জনা এখন নদীতে ফেলাতে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় জনগন বলেন, আমরা চাই, নদী খননের নামে যেসব অভিযোগ আছে সেই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে নদীপথ সচল রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। খনন নিয়ে কোন দুর্নীতি হয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যে কোন কিছুর মূল্যে আমাদের নদী সম্পদ রক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এক শ্রেণির লোভি মানুষ পানি শূন্য নদীতে চলাচ্ছে দখলের উৎসব। একই সাথে বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকার কল-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এবং দূষিত আবর্জনা ফেলার কাজ চলাচ্ছে এখনো। নদীতে দূষিত আর্বজনার কারণে দূষণের মাত্রা এতোই বেড়েছে যে, নড়াই নদী, বালুনদী, আর এই নদীগুলোর দুই পাড়ের সকল বাসিন্দাদের রোগ ব্যধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
নদী নির্ভর সেচ কাজ ব্যাহত হয়ে পড়েছে। মাছ শুণ্য হয়ে গেছে বেশীর ভাগ নদ-নদী। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়বেই। নদীর বয়ে আসা পলিমাটিতেই বাংলাদেশের কৃষিজমি অত্যন্ত উর্বর। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে নদীই ভরসা। পরিবহণের তিন-চতুর্থাংশ নদীপথে। সেচ আর বিদ্যুতের জন্যও নদীর দরকার। নদীর মাছ শুধু দেশের অর্থনীতির স্তম্ভ নয়, বৈদেশিক মুদ্রাও এনে দেয়।
নদী নিয়ে সুনিদৃষ্টি কর্মপরিকল্পনা না থাকায় বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়া ও জলবাযু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নদী স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। খননের অভাবে বালু, শীতলক্ষাসহ অন্যান্য নদীগুলো এখন ধু-ধু বালুচর। এছাড়া অব্যাহত রয়েছে নদী দখল ও দূষণ। ফলে কৃষি, জনস্বাস্থ্য, প্রাণি,উদ্ভিদ হুমকির মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার ভুমি তরিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলা বন্ধ না করলে শুধু ড্রেজিংয়ে কাজ হবে না। প্রতিনিয়তই নদীতে চলছে দখল আর দূষণ। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও ড্রেজিং আমাদের ধারাবাহিক কার্যক্রম। এ কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চলছে। ####