
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
উত্তরের মাঠজুড়ে এখন সোনালি আমনের ঢেউ। কোথাও কাস্তের ঝনঝন শব্দে কাটা হচ্ছে আগাম জাতের আমন, কোথাও চলছে ধান মাড়াই ও ঘরে তোলার ব্যস্ততা। নতুন ধানের ঘ্রাণে কৃষকের ঘরে যেমন উৎসবের আমেজ, তেমনি মাঠে শুরু হয়েছে পরবর্তী ফসলের প্রস্তুতি। আমন কাটার সঙ্গে সঙ্গেই জমিতে নামছে সরিষা, আলু ও আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ। এরপর একই জমিতে চাষ হবে বোরো ধান। “এভাবেই নীলফামারীর ডিমলায় দুই ফসলি জমি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে তিন ফসলি জমিতে”।
আগাম আমনের কারণে একটি ফসল দ্রুত ঘরে তুলে একই জমিতে পরপর আরও দুই দফা ফসল ফলানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষকের আয় ও জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষিতে আসছে বৈচিত্র্য। ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগাম আমন ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। কেউ জমিতে কাস্তে চালাচ্ছেন, কেউ আঁটি বেঁধে ধান বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কোথাও ধান মাড়াই শেষে জমি দ্রুত প্রস্তুত করা হচ্ছে শীতকালীন ফসলের জন্য।
কৃষকেরা জানান, সাধারণ আমন ধান কাটার মৌসুম শুরু হয় নভেম্বরের প্রথম দিকে। কিন্তু আগাম জাতের আমন প্রায় এক মাস আগেই ঘরে তোলা যায়। ফলে আমন কাটার পর জমি ফাঁকা পড়ে থাকে না। দ্রুত জমি প্রস্তুত করে সেখানে ফুলকপি, গাজর, বেগুন, ধনিয়াপাতা, সরিষা, আলু, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শীতকালীন ফসল আবাদ করা সম্ভব হয়। এসব ফসল ঘরে তোলার পর একই জমিতে আবার বোরো ধান আবাদ করা যায়।
ডিমলার শোভানগঞ্জ-বালাপাড়া এলাকার কৃষক বাবলু মিয়া বলেন, আগাম জাতের আমনে সাধারণ আমনের তুলনায় বিঘাপ্রতি প্রায় ২ থেকে ৩ মণ ফলন কম হলেও দ্রুত ঘরে তোলার সুবিধাই বড় বিষয়। তিনি বলেন, “আগাম আমন কাটার পর জমি পড়ে থাকে না। এবার ধান ঘরে তুলে ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতার চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছি। শীতকালীন সবজি তোলার পর একই জমিতে বোরো ধান চাষ করব। এতে একই জমি থেকে এক বছরে বেশি আয় করা সম্ভব।”
সুন্দরখাতা গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগাম আমনের ফলন কিছুটা কম হলেও সময়ের ব্যবধান কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা বেশি লাভ করতে পারেন। তিনি এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। আগাম ধান ঘরে তুলে দ্রুত জমিতে শীতকালীন ফসল আবাদ করতে পারলে একই জমি থেকে বছরে বেশি আয় করা সম্ভব। আগে যে জমিতে দুটি ফসল হতো, এখন সেখানে তিনটি ফসল করার সুযোগ হচ্ছে।”
কৃষকদের মতে, আগাম আমনের মূল সুবিধাই হচ্ছে সময়কে কাজে লাগানো। একটি ফসল দ্রুত ঘরে ওঠায় পরবর্তী ফসলের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। ফলে জমি দীর্ঘদিন পতিত পড়ে থাকে না। আমনের পর শীতকালীন ফসল এবং এরপর বোরো—এই ধারাবাহিকতায় একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে ডিমলা উপজেলায় মোট ২১ হাজার ২৪১ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২১ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আগাম আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। আগাম আমনের উল্লেখযোগ্য জাতের মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৯৩ ও বিনা ধান-১৭। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত উপজেলার প্রায় ৪৫ হেক্টর জমির আগাম আমন ধান কর্তন করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, আগাম আমন কর্তনের পর কৃষকেরা এসব জমিতে সরিষা, আলু ও বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজি আবাদ করবেন। এরপর একই জমিতে বোরো ধান চাষ করা হবে। এতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বাড়বে।
ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, কৃষি বিভাগ তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়াতে কাজ করছে। আগাম আমন কর্তনের পর এসব জমিতে সরিষা আবাদ করা গেলে কৃষক অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি দেশে ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, “আগাম জাতের আমন দ্রুত কর্তনের পর জমিতে সরিষা ও অন্যান্য শীতকালীন ফসল আবাদ করা সম্ভব। সরিষার আবাদ বাড়াতে পারলে দেশের তেলের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি বিদেশ থেকে তেল আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমানো সম্ভব হবে।” তিনি আরও বলেন, কৃষক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সার কার্ড কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে সারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। কৃষকের হাতে নির্বিঘ্নে সার পৌঁছে দিতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ সভার মাধ্যমে আমন ধানের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা নিয়েও সচেতন করা হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগাম আমন, শীতকালীন ফসল ও বোরো ধানের সমন্বিত আবাদ ডিমলার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে বাড়ছে জমির ব্যবহার, কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয়। পাশাপাশি বাড়ছে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণও। আগাম আমন কাটার পর জমি ফেলে না রেখে দ্রুত পরবর্তী ফসলের আবাদ- এভাবেই বদলে যাচ্ছে ডিমলার কৃষির চিত্র। মাঠে সোনালি ধানের শীষ, কাস্তের ঝনঝন শব্দ আর কৃষকের ঘরে নতুন ধান ওঠার উৎসবের মধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে সেই পরিবর্তনের বার্তা।